অনিশ্চয়তাই জীবনের সবচেয়ে মজার ব্যাপার : মেরেডিথ ভিয়েরা

মেরেডিথ ভিয়েরা একজন মার্কিন সাংবাদিক ও উপস্থাপক। বিখ্যাত গেম শো হু ওয়ান্টস টু বি মিলিয়নিয়ার ২০০২ সালে পুরোদমে যাত্রা শুরু করার পর তিনিই ছিলেন প্রথম উপস্থাপক। ২০১৩ সাল পর্যন্ত মেরেডিথ এ অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বোস্টন ইউনিভার্সিটির ১৪২তম সমাবর্তনে বক্তা ছিলেন তিনি।

মেরেডিথ ভিয়েরাআমি বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়িনি। কিন্তু আমার বিশ্বাস, ভাগ্যই আজ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। তোমরা জানো, আমি সাধারণত কোথাও বক্তৃতা করি না। বিশেষ করে, যেখানে আমাকে উপদেশমূলক কথা বলার নির্দেশনা দেওয়া হয়! আমার ‘না’ বলা উচিত ছিল, কিন্তু পারিনি, কারণ যে মানুষটি আমাকে এখানে আসতে বলেছেন, তিনি আমার বন্ধু, এনবিসি নিউজের চেয়ারম্যান অ্যান্ডি লাক। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, এই ৬১ বছর বয়সে আমি চাকরি হারাতে চাই না! আমার চাকরির নিশ্চয়তাটুকু দরকার।

আজ তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্নায়ুচাপে ভোগা একজন বোকা মানুষ। হয়তো আমি আজ ভুলভাল বকব। হয়তো আজ থেকে বহু বছর পর হতাশায় ডুবে কোনো এক পানশালায় বসে তুমি আমাকে দোষারোপ করবে। ভাববে, তোমার জীবনে হতাশার যাত্রা শুরু হয়েছিল এই জঘন্য বক্তৃতাটা থেকে! কিংবা এর চেয়েও দুঃখজনক কিছু হতে পারে। হয়তো বক্তব্য বা বক্তা—কোনো কথা, কারও কথাই তোমার মনে থাকবে না! কিন্তু সে তো ভবিষ্যতের কথা। আর এটা বর্তমান। আমি স্নায়ুচাপে ভুগছি, হয়তো তুমিও। তুমি হয়তো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সামনের অনিশ্চিত সময়ের কথা ভেবে। তুমি হয়তো সব প্রশ্নের জবাব পাওয়ার অপেক্ষায় আছ।

শোনো, তুমি জানো না কী তোমাকে আঘাত করবে। এটাই জীবনের সবচেয়ে মজার ব্যাপার। যদি জানতে শেষ পর্যন্ত তোমার গন্তব্য কোথায়, তাহলে জীবনযাত্রাটা কী ক্লান্তিকরই না হতো!

তোমরা সেই ছোট্ট কুকুরছানার মতো। যখন কোনো কুকুরছানাকে একটি গাড়িতে করে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়, সে জানে না তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে গাড়ির জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখে এবং যাত্রাটা উপভোগ করে।

এটাই বিশ্বাস। যখন তুমি ওপরে ওঠার সিঁড়ি দেখতে পাও না, তখন বিশ্বাসই হচ্ছে প্রথম ধাপ। আমি কখনো সাংবাদিক হতে চাইনি। আমি যখন কলেজের শেষ পর্যায়ে, তখন ইংরেজিকে প্রধান বিষয় করতে ব্যর্থ হই। সত্যিই আমি তখন জানতাম না, আমি কী করতে যাচ্ছি। তবে গ্র্যাজুয়েশন করার আগে কয়েক মাস আমি রেডিও রিপোর্টিংয়ের ওপর একটি কোর্স করেছিলাম। তখন সিবিসি নিউজের একজন প্রযোজক আমার কণ্ঠস্বর শুনে বলেছিলেন, সম্প্রচার সাংবাদিকতায় আমার ভবিষ্যৎ আছে। তারপর তিনি আমাকে ডব্লিউইইআইয়ে (বোস্টনের একটি রেডিও চ্যানেল) ইন্টার্নশিপের আমন্ত্রণ জানান। এর আগে এভাবে আমাকে কেউ বলেনি। তাই আমি কাজটা করার সিদ্ধান্ত নিই। একেবারে অন্ধের মতো আমি সেদিন প্রথম ধাপে পা রেখেছিলাম, যা আজ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।

সুতরাং যদি তুমি কোনো চাকরি খুঁজে না পাও অথবা কোন পথে ক্যারিয়ার গড়বে, সেই পথ খুঁজে না পাও, তবে খামখেয়ালি কোরো না। ভয় অথবা হতাশায় ভুগো না। আজ থেকেই তোমার ভেতরের সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে দাও। তোমার ভালো লাগার জায়গাগুলোতে বিচরণ শুরু করো। যখন অনেক ‘না’ তোমাকে ভোগাবে, তখনো তুমি ‘হ্যাঁ’ বলো।

যখন আমার রেডিও ইন্টার্নশিপ শেষ হয়ে যায়, তখন বার্তা পরিচালক কয়েক মাসের জন্য আমাকে তাঁর সহকারী হিসেবে রেখে দেন। ভাবছিলাম, এরপর কী করব? তখন আমার কাছে আমন্ত্রণ আসে ডব্লিউজার টেলিভিশনে সাপ্তাহিক প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেওয়ার। সেটা ছিল আমার জন্মভূমি রোড আইল্যান্ডে।

আমি তখন দ্রুত সবকিছু শিখে ফেলছিলাম এবং সেটাই ছিল সম্মান অর্জনের পথ। সত্যিকার অর্থে আমার ভেতরের সত্তাকে অনুভব করার শক্তি অর্জন করছিলাম। বাস্তবতা হলো, তোমাদের প্রজন্মের মধ্যেও এই সত্তা অনুভবের সমস্যা আছে। পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে অথবা না হয়ে বলি, অনেক ব্যবসাতেই তোমাদের ডাকা হবে না, কারণ তারা বুঝতে চাইবে তোমার মধ্যে নিজস্বতা আছে কি না। তুমি অলস ও আনুগত্যহীন কি না।

কঠোর পরিশ্রম ও নম্রতার কোনো বিকল্প নেই। তুমি যদি সাফল্যের দরজার কাছাকাছি পা ফেলতে চাও, তবে মানুষের চোখে চোখ রাখো। তুমি চাও, মানুষ তোমাকে সত্যিই পছন্দ করুক, শুধু ‘লাইক’ দেওয়ার জন্য পছন্দ নয়। সর্বোপরি তোমার ভবিষ্যৎ রয়েছে মানুষেরই হাতে, কোনো প্রযুক্তিপণ্যের ওপর নয়।

যারা জীবনের লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছ, এখনই নিজের গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যেয়ো না। জীবন তখনই একটা ঘূর্ণি বল ছুড়ে দেবে, যখন তুমি একেবারেই প্রত্যাশা করোনি! এক শুক্রবার বিকেলে আমার জীবনে সেরা ঘটনাটি ঘটেছিল। ডব্লিউজারে এক বছর কাজ করার পর আমি ভাবছিলাম, আমার জন্য সাংবাদিকতাই সবচেয়ে ভালো। আমি খুব আনন্দ নিয়ে একটা খবর টাইপ করছিলাম। তখনই আমার নিউজ ডিরেক্টর আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, সাংবাদিক হতে যা দরকার, তা আমার নেই এবং আমাকে চাকরিচ্যুত করলেন।

বাড়ি ফিরে আমি ছুটে গিয়ে বিছানায় পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম। তখন বাবা এলেন। সব শুনলেন। বললেন, ‘তুমি কি নিশ্চিত, তুমি যা হতে চাও তা হওয়ার গুণ তোমার মধ্যে আছে?’ বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে কে কী বলল, তাতে কিছু যায়-আসে না। সব সময় এমন লোক থাকবে, যারা তোমাকে পেছনের দিকে টানবে।’

পরের সোমবার আমি সোজা গিয়ে আমার নিউজ ডিরেক্টরের সামনে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘তুমি যা খুশি ভাব, কিন্তু জেনে রাখো, সফল আমি হবই।’ আমি সম্ভবত তাঁকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু তার আগেই সে আমার চাকরি ফিরিয়ে দিল! এটা খুবই চমৎকার একটা ব্যাপার ছিল, কিন্তু কথা সেটা নয়। কথা হলো তুমি নিজে নিজেকে বিশ্বাস না করলে আর কেউ করবে না। সাঁতার শিখতে হলে তোমাকে ডুবতেই হবে।

 সূত্র: টাইম ম্যাগাজিন, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মারুফ ইসলাম

মতামত...